১
টেড ২০১০-এর সেরা আকর্ষণগুলো নিয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ব্লগসাইট দারুণ একটা সিরিজ চালাচ্ছে, সেটা পড়ছিলাম বাসায় আসতে আসতে।
কয়েকবারই মনে হল, আমরা এমন একটা যুগে বসবাস করি, যেখানে প্রযুক্তি খুব সম্ভবত আমাদের মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতার চেয়ে দ্রুত আগাচ্ছে।
আমার এই ভাবনা ভুল হতেই পারে। হয়তো প্রতিটা প্রজন্মেরই এই একই জিনিস মনে হতো/হয়।
কিন্তু জিনিসটা এমন হতে পারে, যে আমরা হয়তো একটা নির্দিষ্ট গতিতে এগিয়ে অভ্যস্ত; বিবর্তনগত একটা মানসিক অভ্যস্ততা আছে। এখনকার ভয়াবহ গতি সেই অভ্যস্ততাটাকে আক্রমণ করছে।
উদাহরণস্বরূপ - আজকে ব্লেইস প্যাস্কাল ডি আগুয়েরার রিয়েলিটি-অগমেন্টেড ম্যাপিং দেখলাম। ফটোসিন্থ নামক এক ভয়াবহ শক্তিশালী, রীতিমত আজগুবি সফটওয়্যার ম্যাপের মধ্যে সিয়াটলের পাইক প্লেসে আগুয়েরার বন্ধুদের লাইভ ভিডিও ধরে এনে ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিল!
রিয়েলিটি-অগমেন্টেড ম্যাপিং শুরু মাত্র। টেড ২০১০-এ এরকম আরো কত কিছুই এসেছে। অবস্থা দেখে আশা জাগছে আমরা জলবায়ু সমস্যাকে পর্যন্ত মোকাবেলা করতে পারবো।
কিন্তু আমাদের মানসের কি হবে? সামলাতে পারবে তো?
২
আরিয়েলি বা কাহনেম্যান পড়লে, বা অন্তত নিজেদের দিকেই গভীরভাবে তাকালেই বোঝা যাবে যে আমরা সাধারণত *পছন্দগতভাবে* যুক্তিসম্মত ব্যবহার করি।
উদাহরণস্বরূপ: ড্যানিয়েল কাহনেম্যান টেড ২০১০-এ দেখিয়েছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ-উপার্জনের ম্যাজিক পয়েন্ট হল মাসে ৫,০০০ ডলার। এরচেয়ে বেশি টাকা কামালে জীবনযাত্রার মানের তেমন উন্নতি ঘটে না, এরচেয়ে কম টাকা কামালে মানুষ সাধারণত তেমন সন্তুষ্ট থাকে না, কারণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ব্যাপক অবকাশ থাকে।
আমেরিকায় ৫,০০০ ডলার হলে বাংলাদেশে সেটা কত? ৪০,০০০ টাকা? ৫,০০০ ডলারের সরাসরি অনুবাদ হল ৩৫০,০০০ টাকা, যেটা বাস্তবসম্মত নয়।
সুতরাং কাহনেম্যানের ফাইন্ডিং-ও কিন্তু লোকালাইজড। আমেরিকার মত প্রথম বিশ্বের দেশ ছেড়ে তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশে আসলেই অন্তত এই ক্ষেত্রে যুক্তির অনুমিতি পাল্টে যায়।
সেভাবে দেখলে বাংলাদেশের গড় সুখ কি আমেরিকার চেয়ে অনেক কম (যতদূর খেয়াল আছে, না)? আমেরিকায় যারা ৫,০০০ ডলারের জন্য হাঁসফাঁস করছে, তারা বাংলাদেশে আসলে কি সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে নিতো না?
তাহলে আমেরিকায় থাকলে তারা পারে না কেন? কারণ সবকিছুই কনটেক্সচুয়াল?
যারা চিন্তা করতে পারে, তাদের তো ১,০০০ ডলারেই সুখী থাকা উচিৎ, তাই না?
৩
কন্ট্রাডিকশনের সাথে বসবাস করা আমাদের জন্য নতুন কিছু না। আমরা এখনো জীবনের বহু মৌলিক প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারি না। নিজেদের আমরা ব্যাপক বুদ্ধিমান মনে করি, কিন্তু অতি আনন্দের চোটে আমরা আত্ম-ধ্বংসের ধারেকাছে পৌঁছে গেছি। এখন নিজেদের ইররাশনাল জিনিয়াসের উপর ভরসা করা ছাড়া তেমন উপায় নেই।
মানুষের মধ্যে নিজেকে অতিরিক্ত কিছু মনে করার যে প্রবনতাটা, এইটাও কিন্তু পুরাপুরি ইররাশনাল না। অতি-আত্মবিশ্বাসের সময় আমাদের মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় আসলেই অনেক ভাল কাজ করে; ভুল করেই হোক বা জেনেশুনেই হোক। সমস্যা একটাই, যে অল্প চান্স থাকে ল্যাপস হওয়ার, তখন বিশাল ধরা। তখন আবারো অতি-আত্মবিশ্বাস ব্যবহার করে সমস্যার সমাধাণ এবং আবারো ধরা, এবং আবারো... এইভাবেই কি চলবে?
*
এখনও আমরা বলতে পারি না ঠিকমত আমাদের মহাবিশ্ব একখান না বহুখান না সাবসেট না প্যারালেল, বা একখান হইলেও সাইজ কি, কার্ভড না ফ্ল্যাট, বা বাকি বুদ্ধিমানগুলি কই।
সেদিক দিয়ে ধর্ম বা দর্শন অনেক নিম্নপর্যায়ের ব্যাপার। সেদিক দিয়েও আমরা সমষ্টিগতভাবে উপসংহারে তেমন পৌঁছেছি যে তা-ও না। এটা ঠিক আমাদের দোষ যে, তা-ও না। কচ্ছপ কিভাবে পাখির কাহিনী জানবে?
সুতরাং এই 'স্টেট অফ ফ্লাক্স' কি নতুন কিছু? আলভিন টফলারের 'ফিউচার শক' ৭০-এর দশকের বই। এখন তাহলে যা হচ্ছে, সেটা তো ফিউচার শক এর বাবা।
আগুন আবিষ্কারের সময় থেকেই আমরা শক খাইতে খাইতেই আগাচ্ছি। মানবসভ্যতার বড়সড় আবিষ্কারের একটা গ্রাফ করলে আমাদের এই আধুনিক যুগ তেমন আউটলায়ার টাইপ কিছু না।
৪
তাই বলে জিনিসটাকে কি এবসোলিউটলি নেয়া যায়? আমরা কি এখনো এমন একটা টেকনো-ইন্টেলেকচুয়ার ক্রসরোডসে পৌঁছাই নাই যেখানে স্পিশিস হিসেবে আমরা একটা মাইলফলকে পৌঁছেছি বলে মনে হয়?
আজকের জলবায়ু পরিবর্তন হয়তো সেরকম একটা ভাবতে-বাধ্য-করা মাইলফলক। ঠিক।
কিন্তু আমরা 'বিবর্তনের স্বপ্নে' কি পৌঁছেছি? বিবর্তনের যদি কোন স্বপ্ন থাকেই, সেটা কি? মানুষের ঈশ্বরায়ণ? সেখানে আমরা কখন পৌঁছবো? তার পর কি? আমাদের আগে কারা কারা পৌঁছেছে? আমরা কি তাহলে তাদের মনস্তত্ত্বের ফিগমেন্ট?
পুরো জিনিসটার পয়েন্টই বা কি?
৫
জীবনের একটা বড় সুবিধা হল, জৈবিক সম্মিলন হিসেবে আমাদের নানাধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে এসব চিন্তা কিছুক্ষণ করে না কুলালে আমরা সহজেই ঝেড়ে ফেলে চা আর একটা সিনেমা নিয়ে বসে পড়তে পারি।
কিন্তু মহাকালের এই যে যাত্রাপথ, এইটা আমরা ঠিক পার করছি কেন? এই বায়োলজিকাল ইমপারেটিভ কার ঠ্যাকায়? এটা কেবলই দূর্ঘটনাবশত (প্রায়-)বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া?
তাহলে আর লাভটাই বা কি, তাৎক্ষণিক আনন্দ ছাড়া?! নাকি আমরা কেবল 'এখন' এবং 'এখনের খাতিরে তখন'-এর জন্যই বেঁচে থাকি?
এইটার বাইরে যদি আর কোন অর্থ না-ই থাকে, তাহলে আপত্তির তেমন কিছু কি আছে?
কি জানি।