১
বেশ কিছুদিন অতি উন্নতমানের কল্পবিজ্ঞান পড়া হচ্ছিল না। হ্যামিলটন আর ব্যাংকস শেষ করার পর ভাল স্পেস অপেরা কম খুঁজিনি। চার্লস স্ট্রস, অ্যালেস্টেয়ার রেনল্ডস, ড্যান সিমন্স, ভার্নর ভিঞ্জ - কোনটাই সেই হ্যামিলটন-ব্যাংকসিয় আমেজটা দিতে পারেনি। ফাঁকতালে ওয়ারহ্যামার ৪০,০০০ এর আইজেনহর্ন সিরিজটা কেমনে কেমনে জানি দারুণ লেগে গেল। ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে আইজেনহর্ন-শিষ্য রাভেনর এর ট্রিলজিখান নিয়ে বসে দেখি আবার যে-কে সেই। 'টু মাচ মিনেশিয়া' দোষে দুষ্ট, তাও ওয়ারহ্যামার আরপিজির; ধুর!
আমি সাধারণত একসাথে চার-পাঁচটা বই পড়ি; হাতে একটা কল্পবিজ্ঞান না থাকলে ভাল লাগে না। বাস্তবতা নিয়ে বিরক্ত লেগে গেলে একটু কল্পবিজ্ঞান চেখে নেই। নাহলে ঠিক পোষায় না।
তো এই স্ট্রস সাহেবের ব্লগে না কোথায় যেন গিয়ে দেখি আবার হাউ-কাউ হুগো-নেবুলা-লোকাস নিয়ে। হ্যানের গল্প কেন স্থান পাইলো না, ত্যানের বইটা দারুণ, অমুক তিনবার জিততে পারতো, তমুক সবচেয়ে আন্ডারএস্টিমেটেড লেখক। এগুলির বেশিরভাগরেই আমি চিনি না।
ইংরেজি ভাষার কল্পবিজ্ঞানে লেখক না চিনলে তেমন অসুবিধা নাই। গার্ডনার ডজোইস আছে, নাহলে রিচ হর্টন। প্রতি বছর দুইজনে দুইটা এনথোলজি বাইর করে, পড়ে নিলেই হয়ে যায়।
কিন্তু আমার ছোটগল্প পড়ে ঠিক আরামও লাগে না। একটা ছোটগল্পে কতটুকুই বা আনা যায়? ৬০০-১২০০ পেজ সাইজের ইয়া গাব্দা বই না পড়লে কিসের আমেজ, কিসের সুইপিং স্টোরি, কিসের ফিনিশিং? আমার পড়া বেশিরভাগ সেরা বই-ই এই 'ইয়া গাব্দা' ঘরানার, সুতরাং ছোটগল্প বা ছোটগল্পের সংকলনকে আমি মোটামুটি ভাল সন্দেহের চোখে দেখি।
কিন্তু ইদানিং আয়ান ব্যাংকসের দারুণ একটা ছোটগল্প সংকলন পড়ে ধারনাটা একটু নাড়া খেলো। বিশেষ করে ব্যাংকসিয় নভেলা 'দ্য স্টেট অফ দ্য আর্ট'-এর মত অসাধারণ জিনিস আমি খুব কম পড়েছি।
যাই হোক, স্ট্রস সাহেবের ব্লগে এসব ধানাই-পানাই দেখে আমি ভাবলাম যাই, নতুন ডজোইস নামাই, ভাল লেখক খুঁজি। পৃথিবীতে নাকি ১০০০ ফুল-টাইম কল্পবিজ্ঞান লেখক আছে, এদের মধ্যে আর একটারেও আমি খুঁইজা পামু না? ক্যামনে কি?
২
আমি আসলে বই প্রথমে আমাজনে (বা এমাজনে, আমার উচ্চারণ সুবিধার না বুঝেনই তো) দেখি, তারপর ভাল লাগলে নামায় ফেলি। ডজোইস এর 'ইয়ারস বেস্ট সায়েন্স ফিকশন সিরিজ' সার্চ দিতে গিয়ে দেখি আরো দারুণ দুইখান এনথোলজি - 'দ্য নিউ স্পেস অপেরা ১' আর 'দ্য নিউ স্পেস অপেরা ২'।
কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে আমার এই স্পেস অপেরা জঁনরাটা অতি অসাধারণ লাগে, তা হোক 'হার্ড' আর হোক 'সফট'। স্পেস অপেরার সেরা লেখকদের নিয়ে এনথোলজি থাকবে, আর আমি সেটা নামাবো না, তা কিভাবে হয়? ;)
যাহোক, আর বই সংগ্রহের কাহিনী নিয়ে প্যাঁচাল না পেড়ে যেই কাহিনী বলতে আসছিলাম সেইটা কইয়া যাই গা।
৩
অ্যালেস্টায়ার রেনল্ডসরে সম্প্রতি টর বুকস এক কোটি ডলার এডভান্স দিসে তার পরের দশটা কল্পবিজ্ঞান গ্রন্থের জন্য। কেন দিসে, সেটা 'মিনলা'স ফ্লাওয়ার' পড়লে বুঝবেন।
মানুষ এইসময় লাখ লাখ গ্রহে ছড়ায় গেছে, কিন্তু আধা-ভন-নিউম্যান, আধা-সাইবর্গ এক শত্রুর সাথেও সংঘাতে লিপ্ত। আরো আছে অতি প্রাচীন, প্রায়-ঈশ্বরসম শক্তিমান সভ্যতাগুলোর কিছু রেলিক, যেমন ওয়েনেট - তারার মাঝের পার্টিকেলবিহীন রাজপথ। মানব কহর্টকে বাঁচানোর জন্য মার্লিন ঘুরে বেড়ায় এই রাজপথে। একটা দুর্ঘটনার কারণে পথের পাশের এক গ্রহে থামে, যেখানে বহু হাজার বছর আগে মানুষ কলোনাইজেশনের জন্য এসেছিল। সভ্যতা এখানে 'আকাশ-পাতাল' রূপ নিয়েছে। কিন্তু যে দুর্ঘটনা মার্লিনকে থামায়, সেই দুর্ঘটনার কারণেই এই গ্রহের সূর্যকে মাঝখান দিয়ে কেটে নিবে ওয়েনেট। মার্লিন এখন কি করবে; 'হাস্কার'-দের থামাতে চলে যাবে না হাজার গ্রহের মাঝে এই এক গ্রহকে বাঁচাবে? কিভাবে?
আমি গল্প-সংক্ষেপ লিখতে অতি-অপটু। যাই হোক, এই গল্পটা এতই ভাল লেগেছিল, খুঁজে পেতে রেনল্ডসের আরেকখান এনথোলজি (জিমা ব্লু এ্যান্ড আদার স্টোরিস) থেকে এর পরের সিকোয়েলটা পড়ে ফেললাম - 'মার্লিনস গান'। আরেকখান *কঠিন* গল্প, যেটার সংক্ষেপ করা প্রায় অসম্ভব।
৪
আগেই বলছি, আমার উদ্দেশ্য ছিল নতুন লেখক খুঁজে বের করা। জন সি রাইট সাহেবের 'দ্য ফার এন্ড অফ হিস্ট্রি' পইড়া মনটা ধেই করে নেচে উঠলো - **পাইসি**। গল্পটা পুরাই মাথার অনেক উপর দিয়ে চলে গেল, কিন্তু ভাবতেই ভাল লাগতেসে যে একটা পুরা ট্রিলজি আছে যেখান থেকে এই গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড পাওয়া যাবে। এই লোক ব্যাংকস না, কিন্তু ব্যাংকস পর্যায়ের হাইপার-আইডিয়াবিদ। আর সে কি ভাষা, সে কি বিশালতা। ফাস্টার-দ্যান-লাইট ছাড়াই বাপধন এই অবস্থা কইরা সারছে। উরিব্বাপ! (ভুলেও এই গল্প সংক্ষেপ করতে কইবেন না। ;) )
রবার্ট চার্লস উইলসনের উট্রিউস্ক কসমি (Utriusque Cosmi) হইলো আরেকখান পিস। গল্পটা যাকে ব্র্যান্ডিং-এর ভাষায় বলতে হয় স্টিকি। লাইগা থাকে গায়ে, যায় না দূরে। পড়ার পর আধা ঘন্টা বস্টন লিগাল খুইলা গল্পের কথাই ভাবসি। :) এই গল্পের মূল থিম হইলো পোস্টহিউম্যান সভ্যতা। একটা কথা এখানে বলেই ফেলি, আইডিয়ার বিশালত্বের দিক দিয়ে স্পেস অপেরার উপরে কোন কল্পবিজ্ঞান নাই। রবার্ট চার্লস উইলসন সাহেব যেন ব্যাংকস আর স্টিফেন বাক্সটারের মাঝামাঝি এক ত্রাস। মহাবিশ্বেরও রক্ষা নাই এই লোকের হাত থিকা।
ট্যাড উইলিয়ামস যে কল্পবিজ্ঞান লেখে আমি জানতাম না। ওনার ড্রাগনবোন চেয়ার আমি পড়সি - একটু ঢিলা কিন্তু ভাল ফ্যান্টাসি (আমার অত ভাল না লাগলেও জনগনের লাগে)। কিন্তু এই লোক 'দ্য টেনথ মিউস' দিয়ে প্রমাণ করে দিল যে লিখতে জানলে সবই লিখন যায়। টেনথ মিউস বুঝলেন তো? শেক্সপিয়রের নাইন মিউসের পরেরটা। মহাশূন্যে এক অজানা আর্টিফ্যাক্ট, এক ভাষাতত্ত্ববিদ, কয়েক জাতির 'নৌবাহিনী', এবং দশম মিউসের খোঁজে গ্যালাক্সি পরিত্যাগ। এগুলিরে ঘুঁইটা যে এইরকম খাসা একটা কিছু লেখা যায়, জানতেন?
বিল উইলিংহ্যামের ফেবলস কমিক্স সিরিজটা অসাধারণ। শুধু আর্ট দেখেই মাটিতে গড়াগড়ি খেতো ভক্তরা। এই ভদ্রলোক যে পুরানধাঁচের, লেন্সম্যান ঘরানার 'ফিয়ারলেস স্পেস পাইরেটস অফ দ্য আউটার রিং'-এ কমিক্সের টান দিয়া এইরকম বানাবেন, এইটা কেডা জানতো? [সত্যি কইরা কই, আমি এই গল্পটা নিজেও এখনো পুরা শেষ করি নাই; কিন্তু পুরা শেষ করতে হবে কেন?]
ড্যান সিমন্স সাহেবের 'মিউজ অফ ফায়ার' গতকাল গভীর রাতে পড়া শুরু করতে গিয়া তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ করা ঘুমায় পড়ছি - শেষ করতে গিয়ে যদি রাত কাবার হয়ে যায়? ওরে বাবারে, শেক্সপিয়রের নাটকের সাথে সুদূর ভবিষ্যতে ভিনজাতির কঠোরগ্রাসে মানবজাতির মুক্তি নিয়া এ কি গল্প। এইটাও শেষ হয় নাই, কিন্তু শুরুটা বড়ই অসাধারণ।
স্কটিশ লেখকদের মাথায় এত বুদ্ধি কেন? আমার মতে স্কটিশরা দুনিয়ার সেরা স্পেস অপেরা লেখক। আয়ান ব্যাংকস, কেন ম্যাকলিওড, চার্লস স্ট্রস (ইংলিশ হলেও এডিনবরা-প্রবাসী, বুঝতে হবে না!) - তারপর আয়ান ম্যাকডোনাল্ড। উরিব্বাপরে, 'ভারথান্ডিস রিং' পড়ে যদি আপনি না বলেন আমি ইহা কি পড়িনু, তাইলে আপনার লগে আর খেলুমই না, ধুর! পুরা লেখাটা একদম... উফফ, কেমনে বলি - এক মহাবিশ্ব থেকেই এক গ্রুপ-সুপারইন্টেলিজেন্স (বা সোজা কথায় 'এক দল অদ্ভূত নামের ঈশ্বর) আরেক গ্রুপ-সুপারইন্টেলিজেন্সকে লাথি মেরে বের করে দিচ্ছে। যেই প্যারালেল ইউনিভার্সে পাঠাচ্ছে সেখানে অবস্থা উল্টা হয়ে গেল। এখন তাদের কি হবে, মাল্টিভার্সই বা কি বলবে? কল্পবিজ্ঞান, থুরি, স্পেস অপেরা পর্ন পুরা। :)
অস্ট্রেলিয়ান লেখক গ্রেগ ইগান এখন সামনে এসে বলে, আরে আমরাও কি কম যাই নাকি? এই ভদ্রলোক সুদূর-ভবিষ্যত প্রযুক্তির 'বিজ্ঞানসম্মত' ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বিখ্যাত। জেন আর এ্যান 'নুডাহ'-দের গ্রহে গেছে প্রায়-আলোর গতিতে, একটা পিনের মাথায় চড়ে। পিনের মাথার দৈর্ঘ্য এক পরমাণু। কেন গেছে? 'নুডাহ'-দের আগের 'নায়াহ' সভ্যতার ত্রিশ লাখ বছরের গাণিতিক সমণ্বায়ন নিয়ে জানতে। আর কইলে আপনেরাই আমার গলা টিপবেন।
যাই হোক, আজকে এতটুকুই রাখি। আমি সাধারণত কথা রাখি না, সুতরাং আরেক পর্ব আসবে বা দুই একটা গল্প অনুবাদের চেষ্টা করবো এমন কিছুই বললাম না। আপনারা কষ্ট করে পড়ে ফেলেন; এমন জিনিস কমই পাবেন। :)