১
'কঠোর পরিশ্রম'-কে যদি আপনার আনন্দদায়ক মনে হয়, তাহলে তো তা আর 'কঠোর পরিশ্রম' থাকে না, থাকে কি?
যেমন: স্ট্র্যাটেজি গেম খেলা আমার বন্ধু আলভীর জন্য কঠোর পরিশ্রমের কাজ। এতটাই, যে সে আমাকে বলেছে তার সামনে 'স্ট্র্যাটেজি গেম'-এর নামই উল্লেখ না করতে। অথচ আমি রাতদিন স্ট্র্যাটেজি গেমই খেলি। এখন যদি আমাকে কেউ প্রশংসা করে বলে: "মনওয়ার কঠোর পরিশ্রম করে স্ট্র্যাটেজি গেম খেলার জন্য", আমার উত্তর কি হওয়া উচিৎ?
আমি বলবো: "নারে ভাই। মজা লাগে তাই খেলি। এটা কঠোর পরিশ্রম কেন হবে?"
'কঠোর পরিশ্রম' শব্দটা শুনলেই মাথায় আসে জীর্ন-শীর্ন শুকনো এক লোকের মেশিন চালানোর মানসদৃশ্য। আমি বুঝি যে কঠোর পরিশ্রমের আরো নানা কনোটেশন আছে। কিন্তু কোন কাজ যদি কেউ আনন্দের সাথে করে, সেটাকে কি আমরা সাধারণত 'কঠোর পরিশ্রম' বলি?
২
ম্যানেজমেন্ট গুরু মরহুম পিটার ড্রাকারের মতে: সকল কিছুর আগে আসে নিজের সেরা ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিতকরণ (স্ট্রেংথ আইডেন্টিফিকেশন)। তারপর আসে উন্নয়নের প্রশ্ন। তবে সেখানেও কথা আছে।
ড্রাকারের মতে, তুমি যেটায় ঢিলা, সেটা ৮০-১০০ বছরে আর কত উন্নতি করতে পারবা? দুনিয়ায় বহু লোক আছে যে সেটায় দারুণ, ওরা ১০ বছরেই তোমারে টেক্কা দিবে। তুমি পারবা অর লগে কম্পিট কইরা? (কম্পিট করতেই হবে ড্রাকার সাব তা বলেন নাই, তবে ব্যবসায় মাত্রই প্রতিযোগিতামূলক কিনা, তাই এই কনটেক্সটে আনছেন হয়তো)।
তারচে' তুমি নিজের সেরা ক্ষেত্রটায় উন্নতি করো না। উন্নয়নের হারও বাড়বে, তোমার মজা পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
একটা উদাহরণ দিবো নাকি?
আমি যেমন অংকে ঢিলা। বহু গবেষণা করে দেখেছি, আমার বন্ধুদের যে অংক করতে ১৫ সেকেন্ড লাগে, আমার লাগে ২০ সেকেন্ড।
চলো দুই বন্ধু মিল্যা প্র্যাকটিস করি।
দেখা গেল, প্র্যাকটিস করার পর আমার বন্ধুর লাগে ১০ সেকেন্ড, আর আমার লাগে ১৭ সেকেন্ড।
এখন আমি অংকে উন্নয়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে পারি। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, আমার বন্ধুর উন্নয়নের হারও আমার চেয়ে বেশি।
গেল।
আমি ইংরেজিতে দারুণ। স্যাট/জিম্যাট ইংরেজিতে প্রেপ ছাড়াই আমার অন্যগো চেয়ে স্কোর অনেক বেশি আসে/আসতো।
এখানে প্র্যাকটিস করতে গিয়া দেখা গেলো, আমার উন্নয়নের হারও বেশি।
এখন তাইলে আমি ইংলিশ ফালায় অংকে কঠোর পরিশ্রম করবো কেন?
হ্যাঁ, যদি এমন হয়, বাজারে অংকের দাম তিন লাখ, ইংরেজির দাম তিন হাজার, তাহলে এই প্রশ্নই আসে না। ঠেইলা অংক করুম। এতটুকু বলতে পারি, প্র্যাকটিস করলে আমিও পারি। ৯৯ না পাই, ৯৬ তুলুম! উপপাদ্য ২৬ ("সাধারণ নির্বচন: দুইটি নির্দিষ্ট বিন্দু হতে সমদূরবর্তী কোন বিন্দুর সঞ্চারপথ উক্ত বিন্দুদ্বয়ের..." এই সারছে! চোখ টিপি ), ৪২ এখনো মুখস্থ আছে মিয়া, কি কন!
কিন্তু বাজারে অংক ইংলিশের দামে তেমন তফাৎ নাই। তাইলে আমি ক্যান অংক করুম?
উত্তর হল: মানসিক উন্নয়নের জন্য। শেখার জন্য। সেসব বাধ্যতামূলক অংক তো ছাড়তে বলছিও না।
তায় আমি এখন নিজে নিজেই অংক করি!
নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এর প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ জাগসিলো আইবিএ-তে পড়ার সময়। সাগান, ব্রাইসন, জুকাভ পইড়া ক্লাস টেনের ফিজিক্স বই ধরলাম। সরি ভাই, মাইন্ড নিয়েন না, কিন্তু... থাক, মাইন্ড করবেন।
এখন কথা হল, পয়সা কামানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে আমার কি হতো?
আমার ধারনা, আই উড বি মাইজারেবল। (তবে না-ও হতে পারে; আমি নিজের সম্পর্কে কতটাই বা জানি?)
এখানে আরেকটা কেস আছে। ইংরেজিতে আমার ভাল হওয়ার পেছনে শয়ে শয়ে বই নামায় পড়ার বিশেষ অবদান আছে। এখন যদি কেউ বলে: "সিরাত ছেলেটা ইংরেজি উন্নয়নের প্রচেষ্টায় বিশেষ অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়াছে।", এটা কি এক্যুরেট হবে?
বইগুলি তো আমি পড়সি আমার মনের আনন্দে!
৩
ইতোমধ্যে আপনারা মনে হয় বুঝে গেছেন যে আমি রবীন্দ্রনাথের আনন্দের সাথে শিক্ষার (এবং পারলে কাজ করার) চরম সমর্থক। আনন্দ না থাকলে কাজ করে লাভ কি? আক্বীদা না থাকলে নামায পড়ে লাভ কি?
তারপরও, দুনিয়াটা ইমপারফেক্ট। ঠ্যাকায় পড়ে অবশ্যই মাঝে মাঝে আমাদের বাঁশ-বুঁশ খেতে হবে। কিন্তু যদি কনসিসটেন্টলি 'কঠোর পরিশ্রম' করতে হয়, সেটা কেমন হল?
এখানে মনে হয় আরো কিছু ব্যাপার আছে। কিছু লোকের কঠোর পরিশ্রম করার 'প্রপেনসিটি' বেশি। এরকম আমাদের ক্লাসে এক ছেলে ছিল, ওয়াসিম আলি রেজা। মাই গড, ছেলে খাঁটতেও পারতো। ও খেঁটে তুলেছিল দারুণ এক সিজিপিএ।
তবে, আরেক ছেলে গায়ে বাতাস লাগিয়ে সেই সিজিপিএ তুলে ফেললো।
এখন কি কইবেন কন? জিনিয়াস বনাম সাধারণ? জিনিয়াস কি লোকালাইজড, না গ্লোবাল? মূল্যবান জিনিয়াস চলক কি কি?
ওয়ারেন বাফেট এখানে ওভারিয়ান লটারির কথা আনেন, আনেন দুনিয়ার ইমপারফেকশনের কথা। লোকে বাফেটরে দেখলেই জিগায়: "তুমার তো টাকার দরকার নাই, তুমি এত টাকা কামাওই বা ক্যান, আর দিয়া করবাই বা কি?"
বাফেট বলে: "দেখো, আমার যে বিশেষ ধরণের অয়্যারিং, সেটা কেমনে কেমনে জানি আধুনিক ফাইনানশিয়াল দুনিয়ার চাহিদার সাথে মিলে গেছে। আমি তো এগুলি কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা করি নাই, মজা করতে শুরু করসিলাম।"
ওয়ারেন বাফেট যা করসেন, সেটা করার মূল কারণ *মজা*, অন্তত জীবনী পড়লে তাই মনে হয়। ভদ্রলোক টাকা জমায় চরম মজা পাইতেন সেই ছোট্টবেলা থেকেই। দুই-একবার যে ফেঁসে যান নাই, তা তো না-ই। ১১ বিলিয়ন ডলার দিয়ে সালোমন ব্রাদার্স কিনে তো আর ফেলে দিতে পারেন না। ছয় মাস খাটতে হল। বা বাফেলো টাইমস। কিন্তু এই যে বাকি ৪০ বছরের 'আনন্দ', ওটা কেউ গুনবে না?
আমরা ওয়ারেন বাফেটের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি: "অনেক খাঁটিলে ফাইনান্সিয়াল মার্কেট ডমিনেট করা বিলিওনিয়ার হওয়া সম্ভব। ইহার জন্য প্রয়োজন নিম্নরূপ:..."
বাফেট নিজে পই পই করে বইয়ের শেষে বলে দিয়েছেন: ভুলেও এ শিক্ষা লবি না। ডু হোয়াট ইউ লাভ। পিলিজ। সুযোগ পাইলেই বাফেট কলেজের পোলাপাইনরে এই কথা বলেন।
৪
পল গ্রাহাম ওয়াই-কম্বিনেটরের প্রতিষ্ঠাতা। এরা স্টার্ট-আপওয়ালাদের অল্প-স্বল্প টাকা বিনিয়োগের জন্য দেয়। বহু স্টার্ট-আপ ওয়াই-কম্বিনেটরের টাকায় 'বড়' হয়েছে।
গ্রাহামের বক্তব্য, আলটিমেটলি, পারসিসটেন্স ট্রায়াম্ফস ইন্টেলিজেন্স। স্টার্ট-আপ বানাইতে ১৪০-এর উত্তরে আইকিউ লাইন ধরেই আসে। এই গ্রুপের মধ্যে পারসিসটেন্স ট্রায়াম্ফস।
এইতো পাওয়া গেল কঠোর পরিশ্রমের প্রমাণ। এরা কঠোর পরিশ্রম করেছে বলেই না অন্যান্য উবার-বুদ্ধিমানরে টেক্কা দিয়েছে।
তাই? নাকি এদের উদ্দেশ্যই সেটা ছিল, উদ্দেশ্য অর্জনের জোশ বেশি ছিল?
এই ধরনের এ্যাবস্ট্রাক্ট পর্যায়ে এসে কেউ বলে কঠোর পরিশ্রম, কেউ বলে জোশ বেশি। আমি জোশ বেশির দলে। ঠ্যাকা বেশি। ইচ্ছা বেশি।
৫
কিন্তু সব কিছু খালি ট্যালেন্ট, স্ট্রেংথ, জোশ, ইচ্ছা-র উপর ছেড়ে দিলে কঠোর পরিশ্রমের কি হবে? কঠোর পরিশ্রমের কি কোনই দাম নাই?
আমার ধারণা, কঠোর পরিশ্রম একটা বাহ্যিক চলক। হয়তো সফল যারা কঠোর পরিশ্রম করে বড় হয়েছে, তাদের কাছে ওটাকে (*অতটা*) কঠোর পরিশ্রম মনে হয় নাই। বাইরের লোক, যাদের হয়তো ওই ইনেট ট্যালেন্টটা নাই, তাদের ব্যাটাকে কঠোর পরিশ্রমী মনে হয়েছে!
এই সব লোকের একটা ড্রাইভ থাকে। সিডনী ওয়েইনবার্গ থেকে ইশতিয়াক রউফ, হেনরি ফোর্ড থেকে অ্যান্থনি রবিন্স (না না, আমি ইশতিয়াককে গ্রেট ম্যান বলছি না, আমি অনেক হিংসুটে; জাস্ট যে ব্যাটা অনেক কষ্ট করসে, এই আর কি; যেমন করসে ওয়েইনবার্গ আর ফোর্ড)।
এই যে আমিও কঠোর পরিশ্রম করে ব্লগ লিখছি। পারবেন আপনি এমন একটা লিখতে?
৬
আমি এখন যেই চাকরি করি, সেটা কি আদর্শ? নাকি আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়?
আদর্শতা মনে হয় এসিম্পটোটিক। ইট এপ্রোক্সিমেটস আদর্শতা, তবে আদর্শ তো না-ই।
কিন্তু কঠোর পরিশ্রমও করতে হয় না। বা হয়তো হয়, আমি জিনিয়াস দেখে টের পাই না।
কিন্তু যেইদিন থেকে টানা কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, সেইদিন থিকা আমি এই চাকরি মনে হয় ছাইড়া দিবো।
কয়েকমাস আগেও 'ট্যালেন্ট বনাম এফোর্ট' নিয়ে আমাদের অফিসে বিশাল এক মেইল এক্সচেঞ্জ হল, প্রায় ৪০ মেইলের (এবং ততগুলি পাতার!)। সেখানে আমি এই মত নিয়েই ছিলাম। আমার এখনকার বস ছিলেন আমার বিপরীত মতের, যদিও শেষ দিকে আমরা কিছু কমন গ্রাউন্ডে পৌঁছেছিলাম।
শেষ মেইলটা ছিল, তাইলে 'আইডিয়াল ভোকেশন'-টা কি? খাঁটুনেওয়ালাদের জন্য, ফাঁকিবাজদের জন্য?
আমার কিছু ধারণা আছে। পরে বলবো। আপাতত এখনকার ভুলগুলো তো ধরুন।